শরবিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সী গোয়েন্দা কাহিনী --Byomkesh Bakshi pdf

 


 


শরদিন্দু অমনিবাস (প্রথম-দ্বাদশ খণ্ড) গ্রন্থে সঙ্কলিত শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাসমূহ বিষয় অনুসারে এক একটি পৃথক খণ্ডে বিন্যস্ত করার পরিকল্পনা অনুসারে গোয়েন্দা গল্প ও উপন্যাসগুলি একত্রে 'ব্যোমকেশ সমগ্র' নামে প্রকাশিত হয় ( মে ১৯৯৫)। শরদিন্দু অমনিবাস-এর প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকা যথাক্রমে সুকুমার সেনের 'ব্যোমকেশ-উপন্যাস' এবং প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের 'ব্যোমকেশ, সত্যবতী, সত্যবতীর গাড়ি' শীর্ষক রচনা দুটিও 'ব্যোমকেশ সমগ্র' গ্রন্থের প্রারম্ভে দেওয়া হয়। গ্রন্থটির বর্তমান সংস্করণে (অক্টোবর ২০০০ ) সংযোজিত পরিশিষ্ট অংশে পুনর্মুদ্রিত হল শরদিন্দু অমনিবাস দ্বাদশ তথা শেষ খণ্ডের প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের লেখা ভূমিকা 'ব্যোমকেশ ও সত্যবতীর প্রস্থান' এবং দ্বিতীয় খণ্ডের পরিশিষ্টে প্রকাশিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের রচনা 'ব্যোমকেশের সঙ্গে সাক্ষাৎকার"।

বিষয় হিসাবে রচনা বিন্যাসের দ্বিতীয় পর্যায়ে লেখকের সমুদয় ঐতিহাসিক উপন্যাস ও গল্প (পাঁচটি উপন্যাস: কালের মন্দিরা, গৌড়মল্লার, তুমি সন্ধ্যার মেঘ, কুমারসম্ভবের কবি ও তুঙ্গভদ্রার তীরে এবং সতেরোটি গল্প) একত্রে 'ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র' নামে প্রকাশিত হয়েছে (জানুয়ারি ১৯৯৮)।

তৃতীয় পর্যায়ে প্রকাশিত হয়েছে লেখকের সমুদর রোমান্টিক উপন্যাস (দাদার কীর্তি, বিষের ধোঁয়া, ঝিন্দের বন্দী, ছায়াপথিক, বহু যুগের ওপার হতে, রিমঝিম, রাজদ্রোহী, মনচোরা, অভিজাতক ও শৈলভবন), একত্রে 'দশটি উপন্যাস' নামে

(সেপ্টেম্বর ২০০০)। পরবর্তী পর্যায়ে আরও দুটি সঙ্কলন গ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি, গোয়েন্দা ও ইতিহাস আশ্রিত গল্প ছাড়া বাকি সমস্ত ছোট গল্পের সঙ্কলন 'শরদিন্দু গল্পসংগ্রহ'। এই গল্পগুলি বিভিন্ন ধরনের—অলৌকিক, হাস্যকৌতুক, প্রেম

এবং সামাজিক। দ্বিতীয়টি, কিশোরদের জন্য লেখা রচনাগুলি একত্রে 'কিশোর রচনা সমগ্র"।

ব্যোমকেশ - উ প ন্যা স

সাধারণ গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে ডিটেকটিভ গল্প-উপন্যাসের জাতের তফাত আছে। ডিটেকটিভ গল্প উপন্যাসকে বলতে পারি একরকম শিকার কাহিনী। অজানা কোন পশু মানুষের প্রাণহানি অথবা অন্যরকম ক্ষতি করেছে; খোঁজ করে, তাড়া করে, ফাঁদ পেতে, বেড়াজালে ঘিরে, কোণ-ঠেসা করে জব্দ অথবা হত্যা করা হল শিকারীর পেশা। আর, অজানা মানুষ জানা মানুষের প্রাণহানি অথবা অন্যরকম ক্ষতি করেছে, তার পরিচয় উদ্ধার করে, তাকে খুঁজে বার করে, তার অপরাধ প্রমাণযোগ্য করে তাকে বিচারালয়ে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো অথবা তাকে দিয়ে অপরাধ স্বীকার করানো হল ডিটেকটিভের কাজ। আবার, শিকার কাহিনীর সঙ্গে ডিটেকটিভ কাহিনীর তফাতও আছে, সে তফাত গুরুতর। শিকার কাহিনী পুরোপুরি শিকারীর ব্যাপার, তার এক তরফা কাহিনী। যে কাহিনীতে অন্বিষ্ট অপরাধী জন্তুর তরফ একেবারেই নেই। ডিটেকটিভ-কাহিনী এমন এক-তরফা নয়, তা দো-তরফা—যেন দাবাবোড়ে খেলা। ডিটেকটিভ বুদ্ধি খেলাচ্ছে অপরাধীকে মাত করতে, অপরাধী বুদ্ধি খাটাচ্ছে ডিটেকটিভের চাল এড়িয়ে চলতে। এই দৃষ্টিতে, ডিটেকটিভ কাহিনীতে দেখতে পাই দুটি ভিন্নমুখী স্রোত। তার মধ্যে একটি হল ডিটেকটিভের কর্ম ও চিন্তা, কেন্দ্রস্থানীয় ও ধীরতর দ্বিতীয়টি হল অপরাধীর কর্ম ও চিন্তা, উৎকেন্দ্রিক ও বিচঞ্চল। ডিটেকটিভ কাহিনীর নায়ক বলতে গেলে একটি নয়, দুটি—অপরাধী এবং ডিটেকটিভ। অপরাধী হল মূল কাহিনীর নায়ক, যে ঘটনাসূত্রের জট পাকিয়েছে। ডিটেকটিভ নায়কের প্রতিপক্ষ নয়, নায়কের শত্রুও নয়, সে নায়কের অভিশাপ, তার কর্মফলের পেয়াদা, যে ঘটনাসূত্রের পাকানো জট খুলছে। অতএব বলা যায়, কাহিনীর পক্ষে ডিটেকটিভ যেন বিধি, অধিনায়ক, যার মধ্যে রচয়িতাও খানিকটা আত্মগোপন করে থাকেন।মাত করতে, অপরাধী বুদ্ধি খাটাচ্ছে ডিটেকটিভের চাল এড়িয়ে চলতে। এই দৃষ্টিতে, ডিটেকটিভ কাহিনীতে দেখতে পাই দুটি ভিন্নমুখী স্রোত। তার মধ্যে একটি হল ডিটেকটিভের কর্ম ও চিন্তা, কেন্দ্রস্থানীয় ও ধীরতর দ্বিতীয়টি হল অপরাধীর কর্ম ও চিন্তা, উৎকেন্দ্রিক ও বিচঞ্চল। ডিটেকটিভ কাহিনীর নায়ক বলতে গেলে একটি নয়, দুটি—অপরাধী এবং ডিটেকটিভ। অপরাধী হল মূল কাহিনীর নায়ক, যে ঘটনাসূত্রের জট পাকিয়েছে। ডিটেকটিভ নায়কের প্রতিপক্ষ নয়, নায়কের শত্রুও নয়, সে নায়কের অভিশাপ, তার কর্মফলের পেয়াদা, যে ঘটনাসূত্রের পাকানো জট খুলছে। অতএব বলা যায়, কাহিনীর পক্ষে ডিটেকটিভ যেন বিধি, অধিনায়ক, যার মধ্যে রচয়িতাও খানিকটা আত্মগোপন করে থাকেন। ডিটেকটিভ গল্পের পাত্রপাত্রীর একজন নয়, গোড়া থেকেই তিনি গল্পের আসরে পরিপূর্ণ স্বরূপে আসন গ্রহণ করেন। সুতরাং তাঁর স্বভাবের ও প্রকৃতির কোন আবর্তন-বিবর্তন বা রাখাঢাকা নেই কাহিনীসূত্রের বয়নে। তবে কোন লেখক যদি একই ডিটেকটিভ নিয়ে কিছুকাল ধরে গল্প রচনা করতে থাকেন তবে কখনো কখনো তাঁর কাহিনীগুলির মধ্যে দিয়ে ডিটেকটিভের জীবনসূত্রের কিছু কিছু টুকরা গাঁথা

পড়ে যায়। এই ভগ্নাংশগুলি থেকে ধারাবাহিক জীবনীকাহিনী না পেলেও ডিটেকটিভের ব্যক্তি-পরিচয়, তার আচার-ব্যবহার ও গৃহজীবনের ইঙ্গিত ইত্যাদি যা পাওয়া যায় তাতে আমরা ডিটেকটিভকে যেন আমাদের পরিচিত সাধারণ মানুষের মেলায় কখনো কখনো দেখতে পাই। তার ফলে মূল কাহিনীতে এমন একটু অতিরিক্ত ভালোলাগার সঞ্চার হয় যার নাম দিতে পারি পরিচয়-রস। তাতে পাঠকের আগ্রহ বাড়ে। ইংরেজী ডিটেকটিভ সাহিত্যে এর উদাহরণ অপ্রচুর নয় । বিশেষ করে দুটি ডিটেকটিভের নাম করা যায় যাঁদের ব্যক্তিগত পরিচয় কাহিনী-পরম্পরায় গাঁথা হয়ে পাঠকের চিত্তে বাস্তবতা পেয়েছে শার্লক হোম্‌স আর লর্ড পিটার উইম্‌সি। একদা অগণিত পাঠক-পাঠিকা শার্লক হোমস যে রক্তমাংসের মানুষ নয়, সার আর্থার কোনান ডয়েলের কল্পনা-সৃষ্ট, সেকথা মানতে চাইত না। এখনকার ভক্ত পাঠকেরা তা মানলেও হোম্‌সকে সত্যিকার মানুষ ভাবতে ভালোবাসেন। এ ভালোলাগার ভালো পরিচয় তাঁর লন্ডনের বাসা নিয়ে গবেষণা, তাঁর আচার-আচরণ নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা, তাঁর "জীবনীগ্রন্থ" রচনা। মানি এ সবই ছেলেখেলা, তবে বুড়ো মানুষের ছেলেখেলা – এ একরকম “পরীর দেশের বন্ধ দুয়ারে হানা দেওয়া। এ ছেলেখেলা প্রবীণ সাহিত্য-চিন্তার চেয়ে কম সার্থক নয়।

বাংলায় প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ গল্প-কাহিনী ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন পাঁচকড়ি দে। এঁর অধিকাংশ রচনাই উপন্যাস এবং সেগুলির কয়েকটি বেশ বৃহৎকায়। ডিটেকটিভ গল্প ইনি দু'চারটির বেশি লেখেন নি। পাঁচকড়িবাবু প্রধানভাবে অনুকরণ করেছিলেন ইংরেজ ঔপন্যাসিক উইকি কলিনসের রচনা এবং ফরাসী ডিটেকটিভ-উপন্যাস লেখক এমিল গাবোরিয়োর ইংরেজী অনুবাদ। পরে কোনান ডয়েলের কাহিনী বার হলে তিনি ডয়েলের রচনা থেকেও মালমশলা কিছু কিছু নিয়েছিলেন। তবে পাঁচকড়িবাবু শার্লক হোম্‌সকে ছোঁন নি। এঁর ডিটেকটিভেরা পুলিস কর্মচারী (কর্মনিরত অথবা অবসরপ্রাপ্ত) কেননা তখনো ডয়েলের হোমসের মতো স্বাধীন-কারবারী ডিটেকটিভের রেওয়াজ হয় নি। তবে, তিনি একটু অগ্রগামীর কাজ করেছিলেন কোন কোন বিষয়ে। তাঁর দুটি প্রধান ডিটেকটিডের ব্যক্তি-পরিচয় পুরোপুরি নেপথ্যে রাখেন নি, এমন কি তাঁদের দু'জনের মধ্যে একরকম পারিবারিক সম্বন্ধও স্থাপন করে দিয়েছিলেন। যাঁরা পাঁচকড়িবাবুর উপন্যাস ছেলেবেলায় আগ্রহ করে পড়েছেন তাঁদের হয়ত মনে পড়বে যে অরিন্দম বসু ছিলেন দেবেন্দ্রবিজয় মিত্রের দাদাশ্বশুর-স্থানীয়। নাত-জামাই দাদাশ্বশুরের অনুগত শিষ্য ছিল, দাদাশ্বশুর নাত-জামাইয়ের উন্নতিকামী ছিলেন। তার বেশি খবর কিছু নেই

পাঁচকড়িবাবু আরও এক বিষয়ে অগ্রগামী ছিলেন। তিনি প্রবীণ ডিটেকটিভকে নবীনের সমভূমিতে রাখেন নি, ঊর্ধ্বভূমিতে তুলেছেন। অরিন্দম যাকে বলে super-sleuth' তাইই। এই super sleuth আইডিয়াটি তখনো পাশ্চাত্য ডিটেকটিভ-কাহিনী লেখকদের মাথায় ভালো করে আসে নি। কোনান ডয়েলের এসেছিল কিন্তু একটি ছাড়া তাঁর কোন গল্পে super-sleuth নেই। যে গল্পটিতে আছে সেখানেও তা ইঙ্গিতে প্রদর্শিত। ডয়েলের super-sleuth হল শার্লক হোমসের দাদা মাইক্রফ্‌ট হোমস, গভর্নমেন্ট আপিসের কেরানি। (গল্পটি যে পাঁচকড়িবাবুর পড়া ছিল, তার প্রমাণ আছে 'নীলবসনা সুন্দরীতে। সেখানে

১. অতিশারী ডিটেকটিভ।

 

click here to download pdf